শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ০৩:০১ পূর্বাহ্ন

প্রতারিত হয়ে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরলো ৬৩ জন

প্রতারিত হয়ে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরলো ৬৩ জন

নন্দিত ডেস্ক:: সহায়-সম্বল সব বিক্রি করে পরিবারের মুখে হাসি ফুটাতে সুদূর মালয়েশিয়ায় এসেও ফিরতে হলো বাংলাদেশিদের। প্রতারণা যেন পিছু ছাড়ছে না বাংলাদেশি কর্মীদের। আর প্রতারণার মাস্টার মাইন্ডরা সব সময় থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। কে করবে এসব মাস্টারমাইন্ড এর বিচার? স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়ার বিমানবন্দরে আড়াই দিন না খেয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে শনিবার (১৩ অক্টোবর) রাতে ৬৩ জন অসহায় কর্মী হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ফিরে এসেছে।

মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কোম্পানীর লোকজন বিমানবন্দর থেকে এসব কর্মীকে গ্রহণ না করায় ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের আটক করে ফিরতি ফ্লাইটের টিকিট যোগাড় করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে। ঢাকা বিমানবন্দরে পৌছে অসুস্থ্ কর্মীরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তারা প্রতারক প্রান্তিক ট্রাভেলসের মালিক গোলাম মুস্তাফা ও মালয়েশিয়ার দালাল ইঞ্জিনিয়ার বাদলুর রহমান খানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ের জোর দাবি জানিয়েছেন।

বিমানবন্দর কল্যাণ ডেক্সের উপ-পরিচালক তানভীর আহমেদ এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। দশ সিন্ডিকেটের একটি প্রান্তিক ট্রাভেলস এন্ড ট্যুরিজম লিমিটেডের মাধ্যমে গত ১১ অক্টোবর এসব কর্মী সাড়ে তিন লাখ টাকা করে দিয়ে মালয়েশিয়ায় গিয়েছিল। প্যাসেজ এসোসিয়েটের পার্টনার আরিফ আলম এসব কর্মীদের মালয়েশিয়ার দালাল ইঞ্জিনিয়ার বাদলুর রহমান খানকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে সুপার ম্যাক্স গ্লোভ ম্যানুফেকচারিং এসডিএন বিএইচডি থেকে কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র এনে প্রান্তিক ট্রাভেলসের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় পাঠায়। মালয়েশিয়ার দালাল বাদলুর রহমান খান মালয়েশিয়ার স্থানীয় এজেন্ট মিঃ এ্যারেকলীকে কোনো টাকা পরিশোধ না করে গা-ঢাকা দেয়।

এ নতুন কিছু নয়! বিগত দিনগুলিতেও “আয়ারল্যান্ডে” পাঠানোর নাম করে হাজার হাজার শ্রমিকদের কাছ থেকে লাখ লাখ রিংগিত হাতিয়ে নেয় এই প্রতারক বাদল।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বাদলুর রহমান আগামী সংসদ নির্বাচনে কালিহাতী থেকে বিএনপি’র হয়ে নমনিশনের জন্য ঘুরছেন! মোট কথা ব্লাকমানি সাদা করতে এমপি হওয়াটা তার জন্য জরুরী হয়ে পড়েছে বলে অনেকেই বলছেন।

এসব কর্মীদের কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর থেকে গ্রহণের জন্য উক্ত সুপার ম্যাক্স কোম্পানীকে অবহিত করেনি বাদল। ফলে কুয়ালালামপুর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ সুপার ম্যাক্স কোম্পানীর লোকজনকে না পাওয়ায় চরমভাবে ক্ষুদ্ধ হয়। বিমানবন্দরে আটককৃত এসব কর্মী প্রায় আড়াই দিন না খেয়ে অসুস্থ্ হয়ে পড়েন। তারা শুধু টেপের পানি খেয়ে দিন কাটিয়েছে। কুয়ালালামপুর থেকে চান্দিনার আমান উল্লাহ, মিন্টু মিয়া,ফারুক হোসেন,আলা উদ্দিন,কালা ফারুক এ তথ্য জানিয়েছেন। কুয়ালালামপুর ইমিগ্রেশন পুলিশ সুপার ম্যাক্স কোম্পানীকে চাপ দিয়ে ৬৩ জন কর্মীর বিমানের ফিরতি টিকিট ক্রয় করে তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়েছে।

মালয়েশিয়া অভিবাসন আইনের ৮(৩) ১৯৫৯/৬৩ ক্ষমতা বলে আসা ওই ৬৩ জন শ্রমিককে ফেরত পাঠানো হয়।

এক শ্রেণির রিক্রুটিং এজেন্সির ষড়যন্ত্রের জালে জড়িয়ে পড়েছে মালয়েশিয়ায় সরকারিভাবে কর্মী পাঠানোর পদ্ধতি ‘জিটুজি’ (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট)। কম খরচে ও অপেক্ষাকৃত বেশি বেতনে কর্মী পাঠানোর সরকারের এ উদ্যোগ ব্যর্থ করতে নানা অপতৎপরতা চালাচ্ছে কতিপয় আদম ব্যবসায়ী।

মালয়েশিয়ার নিয়োগকারীদের ম্যানেজ করে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ে দেশের সরকারের নীতি-নির্ধারকদের পাশ কাটিয়ে কর্মী পাঠানো অব্যাহত রেখেছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এতে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন নিরীহ সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি বাধাগ্রস্থ হচ্ছে জিটুজি পদ্ধতিতে প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মী পাঠানোর গতি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে ও জিটুজি পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় আসা নতুন কর্মীদের অভিযোগের ভিত্তিতে জানা গেছে এসব তথ্য।

আদম ব্যবসায়ীদের এই অপতৎপরতা অব্যাহত থাকলে আবারও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দেশে তৈরি জনশক্তি রফতানিকারক ১০ প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেট কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়ে সাড়ে ৫ হাজার কোটির বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। শুধু তারাই নয়, শত শত কর্মী মালয়েশিয়ায় নির্মম জীবন যাপন করছে।

প্রভাবশালী এই সিন্ডিকেট প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ দূতাবাসকেও জিম্মি করে ফেলেছে। দশটি রিক্রুটিং এজেন্সির সমন্বয় গঠন করা হয়েছে এই সিন্ডিকেট। এর বাইরে কেউ মালয়েশিয়া শ্রমিক পাঠাতে পারবে না। এখন সিন্ডিকেটে যা বলে তাই আইন। একে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা কারও নেই। জি টু জি প্লাস প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়ার সরকার-নির্ধারিত খরচের চেয়ে প্রতিজনে খরচ হচ্ছে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। র্অথাৎ, একজন শ্রমিককে মালয়েশিয়া যেতে নির্ধারিত খরচের ১০ থেকে ১৫ গুণ টাকা গুনতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, খরচের বিষয়ে তাদের মুখ খুলতে বারণ করে দেয়া হয়েছে। মুখ খুললে তাকে আর মালয়েশিয়া পাঠানো হবে না। এমন কি জমাকৃত টাকাও ফেরত দেয়া হবে না। নানা কারণেই কর্মীরা সরকার নির্ধারিত খরচের কথাই সব জায়গায় বলে যায়। বাড়তি ৫ লাখ টাকা আড়াল হয়ে যায়। সিন্ডিকেটের এমন ভয়ে দেশের লাখ লাখ তরুণ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।

ভূক্তভোগি অনেকেই হতাশার সুরে এ প্রতিবেদককে বলেন, তারা খুব শক্তিশালী। সিন্ডিকেট যা করছে তা কোনো মানুষের কাজ না। দানবেও এমন নিষ্ঠুর কাজ করতে পারে না। দেশের গরিব মানুষের টাকা হাতিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কর্মীরা সেখানে খেয়ে পড়ে এক পয়সাও বাড়িতে পাঠাতে পারে না। যে চাকরির কথা বলে তাদের মালয়েশিয়া পাঠানো হয়েছে তার ধারে কাছেও কেউ চাকরি পায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবাসী বলেন আপনাদের হাতে কলম আছে-আপনারা এই ভয়ঙ্কর জালিয়াতির বিরুদ্ধে লেখেন। দেশের লাখ লাখ মানুষ উপকৃত হবে। হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হবে না।

এদিকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী ও শ্রমিকের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনিভাবে বাড়ছে নানা সঙ্কট ও সম্ভাবনাও। খুব শিগগিরই এসব সমস্যা নিরসন না করলে এই বৃহৎ শ্রমবাজারে বাংলাদেশ কাঙ্খিত অবস্থান ধরে রাখতে পারবে না।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *







© All rights reserved © 2017 Nonditosylhet24.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ