২৭ জুলাই ২০২১ ০৯:৩৬ অপরাহ্ন

২৭ জুলাই ২০২১ ০৯:৩৬ অপরাহ্ন

নন্দিত ডেস্ক

জুলাই ১৯, ২০২১
৯:৫৬ পূর্বাহ্ন


আইসিইউ-অক্সিজেন সংকটে চরম ভোগান্তি


করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণে বাড়ছে গুরুতর রোগীর সংখ্যা। বেড়েছে আইসিইউ ও উচ্চ চাপের অক্সিজেনের চাহিদা। রোগীর জন্য আইসিইউ পেতে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন রোগীর স্বজনরা। কোথাও খালি নেই আইসিইউ। প্রতি দশ মিনিট পর একটি করে এম্বুলেন্স এসে থামছে হাসপাতালের সামনে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালে কিছু আইসিইউ খালি থাকলেও দক্ষ লোকের অভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না। আবার কোথাও কিছু আইসিইউ অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে। বাইরের জেলা থেকেও অনেক রোগী আসছেন।

৩৬ জেলায় কোনো আইসিইউ সুবিধা নেই। গত বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী সব জেলা হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা কার্যকর হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত ১৮ই জুলাই রাজধানীর সরকারি ৬টি হাসপাতালে মাত্র ৫৭টি ও বেসরকারি হাসপাতালে ১০০টি আইসিইউ শয্যা ফাঁকা ছিল। ঢাকা মহানগরে সরকারি ও বেসরকারি মিলে আইসিইউ শয্যা রয়েছে ৮৭৮টি। এর মধ্যে ফাঁকা আছে ১৫৭টি। করোনা রোগীর সেবার জন্য সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলে আইসিইউ রয়েছে ১ হাজার ২৯১টি। এর মধ্যে খালি আছে ২৫৯টি। ঢাকা মহানগরসহ ঢাকা জেলায় আইসিইউ’র সংখ্যা ৯৪১টি। এর মধ্যে ফাঁকা আছে ১৭৭টি। ঢাকা মহানগরে ১৬টি সরকারি হাসপাতালের মধ্যে ৩টিতে আইসিইউ সুবিধা নেই। বাকি ১৩টি হাসপাতালের মধ্যে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বার্ন ইউনিট, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে কোনো আইসিইউ ফাঁকা নেই। কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে ১টি, শেখ রাসেল গ্যাসট্রোলিভার হাসপাতালে ১টি, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ২টি আইসিইউ, শ্যামলী ২৫০ শয্যা টিবি হাসপাতালে ১২টি, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ৪টি, ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালে ৩৬টি আইসিইউ ফাঁকা থাকার হিসাব দেয় স্বাস্থ্য বিভাগ।

এদিকে গতকাল সকাল থেকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটের সামনে রোগীদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। একটির পর একটি এম্বুলেন্স হাসপাতালে রোগী নিয়ে প্রবেশ করছে। আবার সমান ভাবে এম্বুলেন্সগুলো রোগী নিয়ে ছুটছে অন্য হাসপাতালে। চিকিৎসারত করোনা আক্রান্ত রোগীদের এখানে কোনো আইসিইউ শয্যা খালি না থাকায় অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন। আবার অনেক শ্বাসকষ্টের রোগীরা অক্সিজেন লেভেল কমে যাওয়ায় বিভিন্ন জেলা হাসপাতাল থেকে আইসিইউ শয্যা পেতে ছুটে এসেছেন ঢাকায়। সরজমিন দেখা যায়, গতকাল দুপুরের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটের সামনে এক ঘণ্টায় ১৩ জন শ্বাসকষ্টের রোগী চিকিৎসার জন্য এসেছেন। তারা ঢাকা এবং বিভিন্ন জেলায় চিকিৎসারত ছিলেন। হঠাৎ রোগীদের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় রোগীর স্বজনরা নিয়ে ছুটে এসেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অনেকে আবার মেডিকেলে আইসিইউ শয্যা খালি না থাকায় অবস্থার অবনতি হওয়ার অন্য হাসপাতালে যাচ্ছেন। হাসপাতালের আইসিইউ শয্যা খালি না থাকায় চিকিৎসকরা তাদেরকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। জরিনা বেগম (৫০) ঢাকা মেডিকেলে ৩ দিন ধরে ভর্তি ছিলেন। তার অবস্থার অবনতি হওয়ার কারণে আইসিইউতে নেয়ার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা খালি নেই। চিকিৎসকরা তাকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। রোববার দুপুরে ওই রোগীর স্বজনরা এম্বুলেন্সে করে তাকে অন্য একটি হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখা যায়।

হাসপাতালের বাইরে কথা হয় অন্য একজন রোগীর স্বজনের সঙ্গে। তিনিও গত পাঁচ দিন ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি ছিলেন। তার অক্সিজেন লেভেল অনেক কমে যাওয়ায় উচ্চ মাত্রার অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ে। ঢাকা মেডিকেলে এই সুবিধা না পাওয়ায় ওই রোগীকে রাজধানীর গ্রীন রোডের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আজিম উদ্দিন (৬৩)কে ঢাকা মেডিকেলে আনা হয় মেহেরপুর থেকে। এখানে আইসিইউ না পেয়ে ঢাকার অন্য হাসপাতালে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। ফেনী থেকে মিজানুর রহমান (৫৫) শ্বাসকষ্ট ও কাশি নিয়ে এসেছেন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসার জন্য। স্ত্রী রাশেদা আক্তার জানান, দুইদিন ধরে তার প্রচণ্ড কাশি দেখা যায়। স্থানীয় সদর হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে কিছু মেডিসিন দেন। গত রাত থেকে তার কাশির সঙ্গে শ্বাসকষ্টও বাড়ে। তখনই তাকে আবার হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু ডাক্তার তেমন কিছু না বলে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যেতে পরামর্শ দেন। আরেক রোগী রাশেদা বেগম (৬০)। চাঁদপুর থেকে এসেছেন ঢাকা মেডিকেলে। তার মেয়ে সাথী আক্তার বলেন, এক সপ্তাহ ধরে তার মা’র শরীরে জ্বর। সঙ্গে সর্দিও। শরীরের জ্বর একটু কমলেও সর্দি কমেনি। চাঁদপুরের একটি হাসপাতালে তাকে ডাক্তার দেখানো হয়েছে। সেখানে করোনা টেস্ট করানো হয়নি। সকাল থেকে তার হালকা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে এই হাসপাতালে নিয়ে আসি। এখানে ডাক্তারের অপেক্ষায় আছি। হাসপাতাল থেকে করোনা টেস্ট করাতে বলছে। করোনা পজেটিভ হলে এখানেই চিকিৎসা করানো হবে। টাঙ্গাইল থেকে এম্বুলেন্সে করে এসেছেন হালিমা বেগম। মুখে নরমাল অক্সিজেন সাপোর্ট দেয়া। তিনি টাঙ্গাইলের একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তার স্বজনরা জানান, গত চারদিন ধরে হালিমা বেগমের জ্বর। হাসপাতাল থেকে করোনা পরীক্ষার কথা বলা হয়। নমুনা নেয়ার পরে তার পজেটিভ আসে। একদিন পরে তার হালকা শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। বিকাল হতে না হতেই অক্সিজেনের লেভেল কমতে থাকে। তখন হাসপাতাল থেকে ঢাকা চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। প্রথমেই তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসি। এখানে ডাক্তার এখনো দেখানো হয়নি। ডাক্তার দেখানোর পরে বলা যাবে কোথায় চিকিৎসা করানো হবে। তার প্রয়োজন এখন অক্সিজেনের। এখানে অক্সিজেন সাপোর্ট পাওয়া গেলে তাকে এখানে চিকিৎসা করাবো। অন্য কোথাও নেয়া হবে না। আর যদি আইসিইউ না পাওয়া যায় তাহলে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাবো। দুপুরের পর থেকে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় আমেনা বেগমের। শরীরে কোনো ধরনের করোনার উপসর্গ নেই। হালকা শ্বাসকষ্ট থাকায় তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসা হয়। আমেনা বেগমের ছেলে আবির জানান, তার মায়ের শরীরে কোনো ধরনের করোনার উপসর্গ নেই। দুপুরের পর থেকে হালকা শ্বাসকষ্ট দেখা যায়। এরপর তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসি।

চট্টগ্রামে সরকারি হাসপাতালে ৩৩টি এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৩০টি আইসিইউসহ মোট ৬৩টি শয্যা রয়েছে। এরমধ্যে সরকারি হাসপাতালে ফাঁকা আছে ১২টি এবং বেসরকারি ১০টি আইসিইউ খালি আছে। চট্টগ্রাম মহানগরসহ চট্টগ্রাম জেলায় খালি আছে ২৩টি শয্যা। এদিকে ময়মনসিংহ বিভাগে ২২টির মধ্যে ৮টি ফাঁকা আছে। রাজশাহীতে ৫৮টির মধ্যে ৯টি, রংপুর বিভাগে ৪৪টির মধ্যে ১৮টি, খুলনা বিভাগে ৬৭টির মধ্যে ১৩টি, বরিশালে ৩৩টির মধ্যে ১১টি এবং সিলেট বিভাগে ২২টির মধ্যে শূন্যটি আইসিইউ ফাঁকা রয়েছে। অন্যদিকে সারা দেশে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা সুবিধা আছে ১ হাজার ৭২৫টি, অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ১ হাজার ৮৮৭টি। অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংখ্যা ২৬ হাজার ৪৬৮টি। সারা দেশে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন আছে মোট ১০৭টি। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৫৪টি, চট্টগ্রামে ১৩টি, রাজশাহী ৭টি, রংপুরে ১২টি, খুলনায় ১০টি, বরিশালে ৬টি, সিলেটে ২টি এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৩টি লাইন রয়েছে।