সিলেটে গণসমাবেশ ঘিরে উত্তাপ-উত্তেজনা

বিএনপির সিলেট বিভাগীয় গণসমাবেশের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে উত্তাপ-উত্তেজনা। শনিবারের গণসমাবেশ সফল করতে দলটির নেতাকর্মীরা ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে প্রচার চালালেও তাদের ভেতরে গ্রেফতার আতঙ্ক কাজ করছে। গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে হবিগঞ্জের লাখাইসহ বিভাগের কয়েকটি স্থানে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে কয়েকটি মামলাও হয়েছে। সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানা, ওসমানীনগর থানা, বিয়ানীবাজার থানা, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে দায়ের হওয়া এসব মামলায় বিএনপির সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৩ জন গ্রেফতার হয়েছেন। এর মধ্যে সিলেটে ৪ জন, মৌলভীবাজারে ৪ জন ও হবিগঞ্জে ৫ জন। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রেফতার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। যদিও বিষয়টি মানতে নারাজ সিলেট জেলা নেতারা। তাদের দাবি বিএনপির নেতাকর্মীরা এখন আর গ্রেফতারকে ভয় পায় না। যে কোনো পরিস্থিতি স্থানীয় বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, গণসমাবেশ বানচাল করতে আওয়ামী লীগ ও পুলিশ একসঙ্গে কাজ করছে। তারই ধারাবাহিকতায় সিলেটের বিয়ানীবাজার, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে গণসংযোগে বাধার সৃষ্টি করছে। ওসমানীনগরে বিএনপি চেয়াপারসনের উপদেষ্টা তাহসিনা রুশদীর লুনার গাড়িবহরে পুলিশের উপস্থিতিতে হামলা হয়েছে। এ ধরনের আরও হামলার ঘটনা ঘটতে পারে। 


সবমিলে সমাবেশ যত ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে উত্তাপ। সমাবেশের দুই দিন আগে শুরু হওয়া আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ইজতেমার সময় কিছুটা কমিয়ে আনা হয়েছে। শুক্রবার বাদ জুমার পরিবর্তে সকাল ১০টার মধ্যে ইজতেমা শেষ করা হবে। বুধবার সন্ধ্যায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ এসএমপির কমিশনারের সঙ্গে আয়োজকদের এক সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়। সভায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। 


বুধবার নগরীতে পৃথক প্রচার মিছিল করেছে জেলা যুবদল, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। প্রচারে আছেন জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতারাও। সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ নন্দিত সিলেট কে জানান, সমাবেশ সফল করতে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নেমেছেন। বিভাগজুড়ে চলছে প্রচার। মোকাবিলায় প্রস্তনেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রেফতার আতঙ্ক প্রসঙ্গে তিনি জানান, বিএনপির নেতাকর্মীরা এখন আর গ্রেফতারকে ভয় পায় না। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত। 

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট বিভাগ) ও সাবেক এমপি কলিম উদ্দিন মিলন জানান, গণসমাবেশ বানচাল করতে ক্ষমতাসীনরা স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবহার করছে। বিভিন্ন স্থানে মামলা দিয়ে নেতাকর্মীদের হয়রানি করছে। ইতোমধ্যে ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে গ্রেফতার আতঙ্ক ছড়িয়ে সমাবেশ বানচাল করা যাবে না। বিভাগজুড়ে গণসমাবেশকে ঘিরে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে জাগরণের যে ঢেউ উঠেছে সেই ঢেউ শনিবার সিলেট শহরে আছড়ে পড়বে। বিএনপির অভিযোগ প্রসঙ্গে পুলিশের সিলেট রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়া পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করছে না। তাদের প্রচারপত্র বিলি বা গণসংযোগে পুলিশ বাধা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। 


এদিকে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশ সফল করতে আজ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা সিলেটে আসছেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন গণসমাবেশের সমন্বয়ক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান এবং যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল।


লাখাইয়ে পুলিশ বিএনপি সংঘর্ষে অর্ধশত আহত : হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিলেট বিভাগীয় গণসমাবেশ সফল করার লক্ষ্যে হবিগঞ্জের লাখাইয়ে বিএনপি সমাবেশকে কেন্দ্র করে দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে পুলিশসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় উপজেলার বামৈ বাজারে এ ঘটনা ঘটে। এনিয়ে পুলিশ ও বিএনপির পক্ষ থেকে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পাওয়া গেছে। 


বিএনপির কেন্দ্রীয় সমবায় বিষয়ক সম্পাদক জি কে গউছ জানান, সিলেটে গণসমাবেশ সফল করার লক্ষ্যে সন্ধ্যায় বামৈ বাজারে দলের অস্থায়ী কার্যালয়ে কর্মী সমাবেশ চলছিল। এ সময় হঠাৎ লাখাই থানার ওসি তদন্ত চম্পক ধাম, এসআই দেবাশিষ ও এসআই রাব্বিসহ ৫০/৬০ জন পুলিশ হামলা চালায়। তারা গুলি ছুড়ে শতাধিক নেতাকর্মীকে আহত করে। গাড়ি, মোটরসাইকেল ভাংচুর করে। এ সময় সভাপতির আসন থেকে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ মিয়াকে তুলে নিয়ে যায় তারা। তবে লাখাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুনু মিয়া জানান, তাদের অভিযোগ সঠিক নয়। পুলিশের ওপরই তারা প্রথম আক্রমন করেছে। তিনি বলেন, আমরা সমাবেশ সংক্ষিপ্ত করার জন্য অনুরোধ জানাই। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এতে ৭/৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেশ কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করা হয়েছে। 


এ নিয়ে বুধবার রাতে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, যতই হামলা-মামলা করা হোক না কেন সিলেটের সমাবেশে জনস্রোত ঠেকানো যাবে না। লাখাইয়ে বিএনপির প্রস্তুতি সভায় পুলিশের হামলাকে ‘নারকীয়’ উল্লেখ করে নেতাকর্মীদের আহত করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন রিজভী। তিনি বলেন, হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে গণসমাবেশের লিফলেট বিতরণের পর নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশ আক্রমণ চালিয়ে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক জাহির হোসেনকে গ্রেফতার করেছে।


সমাবেশের দিন বাস ধর্মঘটের ডাক : এদিকে সমাবেশের দিন বাস ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে মালিক সমিতি। শনিবার সকাল ৬টা থেকে পরদিন ভোর ৬টা পর্যন্ত বাস ধর্মঘট পালিত হবে। বিষয়টি নিশ্চিত করে সিলেট জেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল কবির পলাশ। তিনি দাবি করেন, এই ধর্মঘটের সঙ্গে বিএনপির সমাবেশের কোনো সম্পর্ক নেই। পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। সিএনজি অটোরিকশায় গ্রিল সংযোজন, রেজিস্ট্রেশনবিহীন অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করা, নতুন করে অটোরিকশার নিবন্ধন না দেওয়ার দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছিলাম। কিন্তু প্রশাসন কিছুই জানায়নি। তাই বাধ্য হয়ে প্রতীকী ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। 

২৫টি কমিউনিটি সেন্টার বুকিং : শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন থাকায় ওইদিন অনেকেই সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকেন। কিন্তু শুক্রবার নগরীর ২৫টি কমিউনিটি সেন্টার বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নামে বুকিং হয়ে যাওয়ায় এসব অনুষ্ঠান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন অনেকেই। 


সিলেট নগরীর আগ্রা, মালঞ্চ, নুরে আলা, সাজিদ আলীসহ আরও কয়েকটি কমিউনিটি সেন্টারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সবগুলোই ১৮ নভেম্বর রাতের জন্য ভাড়া হয়েছে মেয়রের নামে। তিনি সিলেটে বিএনপির গণসমাবেশের আবাসন ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক। সমাবেশের আগে চলা আসা নেতাকর্মীদের জন্য মেয়র এসব কমিউনিটি সেন্টার বুকিং করে রেখেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বিএনপির এক নেতা জানান, মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর পক্ষে বুকিং করা কমিউনিটি সেন্টারে কর্মীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। এ ছাড়া নগরের খোলা মাঠগুলোতেও কর্মী-সমর্থকদের রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি কমিউনিটি সেন্টারের ম্যানেজার জানান, মেয়র সাহেব চাইলে তো দিতেই হয়। না দিয়ে পরে নগরভবনের বাড়তি ঝামেলায় পড়তে হবে। কমিউনিটি সেন্টার ছাড়াও নগরীর বিভিন্ন মসজিদে বিএনপির নেতাকর্মীদের রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।


সিলেটে পুলিশের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ইজতেমা শুরু : সিলেটে পুলিশের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দু’দিনের ইজতেমা শুরু করেছে আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। দক্ষিণ সুরমার পারাইরচকের ট্রাক টার্মিনালে এই ইজতেমার আয়োজন করা হয়। মঙ্গলবার রাত থেকেই সংগঠনের নেতাকর্মীরা সেখানে অবস্থান নেন। বুধবার দিনব্যাপী বয়ান করেন স্থানীয় আলেম-উলামা। আজ সকালে ইজতেমার উদ্বোধন করবেন আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর মুফতি মাওলানা মুহাম্মদ রশিদুর রহমান ফারুক বর্ণভী। বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশের দুদিন আগে ইজতেমার আয়োজন করায় নাশকতার আশঙ্কায় পুলিশ মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টায় ইজতেমার তারিখ পেছানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। পুলিশের এ প্রস্তাবের পরই আঞ্জুমানের নেতাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারা নির্ধারিত তারিখে ইজতেমা বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। এর পরই সিলেটের বিভিন্ন এলাকা থেকে মঙ্গলবার রাত এবং বুধবার সকালে ইজতেমাস্থলে মুসল্লিরা ভিড় করেন। তবে ইজতেমার পূর্বনির্ধারিত সময় কিছুটা কমিয়ে আনা হয়েছে। কাল বাদ জুমার পরিবর্তে সকাল ১০টার মধ্যে ইজতেমা শেষ করা হবে।