২৬ জানুয়ারী ২০২১ ০৩:০১ পূর্বাহ্ন

২৬ জানুয়ারী ২০২১ ০৩:০১ পূর্বাহ্ন

ধ্রুব গৌতম

জানুয়ারী ০৪, ২০২১
৭:৪৯ অপরাহ্ন


প্রবীণ বেহালাবাদক সুবল দত্ত’র ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে


প্রবীণ বেহালাবাদক সুবল দত্ত’র ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে খেলোয়াড় থেকে শিল্পযোদ্ধা সুবল দত্ত বাংলাদেশের গুণী যে ক’জন শিল্পী দেশের মুক্তি সংগ্রামে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন, সুবল দত্ত তাদেরই একজন। স্বাধীনতার পূর্বাপর তাঁর ভূমিকা প্রশংসনীয়। বেহালার সুরের মুর্চ্ছনায় আজও তিনি বেঁচে আছেন সংগীত অনুরাগীদের হৃদয়ে, দেশের ইতিহাসে। সিলেটের সাথে সুবল দত্তের অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। সে সময়ের খ্যাতিমান শিল্পী আর সিলেটের সন্তান নির্মল চৌধুরী, সুজেয় শ্যাম, শিবু ভট, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য, বিদিত লাল দাস, ইয়ামীন চৌধুরীদের সাথে ছিলো সুবল দত্তের আত্মিক বন্ধন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী সৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবল দত্ত ২৩ জানুয়ারি ১৯৪১ সালে ঢাকার মুন্সিগঞ্জ জেলার (বিক্রমপুর) টঙ্গীবাড়ী থানার আউটশাহী গ্রামের এক সম্ভান্ত

পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫৮ সালে ঢাকার পগোজ হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তৎকালীন কায়েদ-ই-আযম কলেজে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী কলেজ) অধ্যয়ন করেন। স্কুল কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় ঢাকার প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগে এবং প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লীগের খেলোয়াড় হিসেবে অধিক খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তিনি আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের ফরোয়ার্ড ছিলেন। তিনি ফুটবল ক্রিকেটে সমান খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৩৯ সালে অবিভক্ত বাংলার অল ইন্ডিয়া রেডিও ঢাকার প্রথম প্রচারের প্রথম নিজস্ব শিল্পী স্বর্গীয় ফটিক চন্দ্র দত্ত’র সুযোগ্য পুত্র হলেন সুবল দত্ত। বাবা প্রখ্যাত বেহালাবাদকের কাছে ছোটবেলাতেই তাঁর বেহালায় হাতেখড়ি। প্রতিভাধর খ্যাতিমান বাবার পরিচর্যায় তিনি লেখাপড়ার পাশাপাশি বেহালা বাদন সাধনায় মনোযোগ দান করেন। তিনি তাঁর আপন বড় ভাইয়ের সাথে বন্ধুর মত একত্রে চলে বড় হয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি ওস্তাদ সাদেক আলী মিয়ার কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি প্রখ্যাত ক্যারিওনেট বাদক হিসেবে রেডিওতে কর্মরত ছিলেন। ওস্তাদ ফুলঝুরি খান, ওস্তাদ খাদেম হোসেন, ওস্তাদ মীর কাশেম খান, ধীর আলী মিয়া, কানাই লাল শীল, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খান, সমর দাস, আব্দুল আহাদ, মোবারক আলী প্রমূখ গুণী শিল্পীদের সান্নিধ্য লাভ করেন রেডিওতে চাকুরীর সুবাদে। মরহুম মনসুর আরী তাঁর পথ প্রদর্শক। ১৯৬০ সালে তিনি অনিয়মিত শিল্পী হিসাবে ঢাকা বেতারে যোগদান করেন এবং ১৯৬২ সালে নিয়মিত শিল্পী হিসেবে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তান ঢাকায় একজন বেহালা বাদক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ ইংরেজী পর্যন্ত করাচীতে পিআইএ আর্টস একাডেমীতের্ চাকুরী করেন। দেশের বৃহত্তম সংস্কৃতির স্বাথে১৯৬৯ সালে শেষের দিকে পিআইএর চাকরী ছেড়ে দিয়ে পূর্ব বাংলায় চলে এসে আবার রেডিওতে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে “স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের” একজন সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে সক্রীয় ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ বেতার ঢাকায় পুনরায় নিজস্ব শিল্পী হিসেবে যোগদান করেন। উল্লেখ্য ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য হয়ে পৃথিবীর আঠাশেরও অধিক দেশ সফর করেন। তার মধ্যে ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, মিশর, ইতালী, থাইল্যান্ড, ফ্রান্স, কোরিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, হংকং, মধ্যপ্রাচ্য উল্লেখযোগ্য। একজন শিল্পী সংগঠক হিসেবেও জীবনের অনেকটা সময় জুড়ে ব্যস্ত থেকেছেন “বাংলাদেশ সঙ্গীত পরিষদ’র প্রথম সহ-সভাপতি এবং বাংলাদেশ ‘যন্ত্র শিল্পী সংস্থা’র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে র্দীঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও নিজস্ব শিল্পী সংগ্রাম পরিষদ বাংলাদেশ বেতারের আহŸায়কের দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই একজন বেহালা বাদক এবং ১৯৮৪ সালে সুরকার হিসেবে আত্ম প্রকাশ করেন। শিল্পী বাছাই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ বেতারের সূচকধ্বনি তিনি বাজিয়েছেন যা সারা বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচয় বহন করছে। তিনি একজন গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা। সুবল দত্ত ১৯৭২/৭৩ সালে “অতিথি” নামে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন স্বীয় অর্থায়নে। সঙ্গীত জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র সত্য সাহা এ ছবিতে সঙ্গীত প্রযোজনা করেন। ছবির শ্রেষ্ঠাংশে ছিলেন শাবানা, রাজ্জাক ও আলমগীর। ছবিটির কাহিনী, সংগীত ও সংলাপ এখনো দর্শকের স্মৃতিপটে জীবন্ত। ছবিটি সে সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলো। সুবল দত্ত ২০১৫ সালের ৪ঠা জানুয়ারি ভোর ৬টায় ঢাকা বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেশবরেণ্য চিকিৎসক ডা: কনককান্তি বড়–য়ার তত্বাবধানে চিকিৎসাধীন থেকে বাহাত্তর বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। জননন্দিত নাট্যাভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর তখনকার সময়ে সংস্কৃতি মন্ত্রী থাকায় নিজ উদ্যোগে সুবল দত্তের মরদেহ সিলেটে পাঠান। সিলেট কেন্দ্রিয় শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে রাষ্ট্রিয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। সিলেট চালিবন্দর মহাশ্মশানঘাটে তাঁর দাহকার্য সম্পন্ন হয়। সুবল দত্ত সিলেট জেলা শহরের সেখঘাট এলাকায় সুধীর রঞ্জন দত্ত ও বীণাপাণি দত্তর তিন মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে প্রথম সন্তান বাসন্তি দত্ত’র সাথে ১৯৬৮ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বাসন্তি দত্ত ওস্তাদ খুরশীদ খানের শিষ্য ছিলেন। সুবল দত্ত নি:সন্তান থাকার তাঁর দাহ কার্য সম্পাদন করেন তাঁরই শ্যালক তপু দত্ত।